মার্কেট প্লেস

মার্কেটপ্লেস কি?
মার্কেটপ্লেস শব্দটি অনেকের কাছে নতুন কিছু বলে মনে হতে পারে। আসলে কিন্তু এটি নতুন কোন বিষয় নয় বরং ভাবুনতো মার্কেট বলতে আমরা কি বুঝি? নিশ্চয় সকলে এটাই বলবেন যে, মার্কেট হচ্ছে পণ্য কেনা-বেচার জায়গা। এর সাথে আর একটু যোগ করুন, যেখানে একপক্ষ পণ্য বেচতে যায়, আর অন্য পক্ষ পণ্য কিনতে যায়। ব্যাস হয়ে গেল, আউটসোর্সিংর এর সাথে দুটো পক্ষ জড়িত, এক পক্ষ কাজ করাতে চান, আর পক্ষ কাজ করতে চান। যিনি কাজ কাজ করাতে চান আউটসোর্সিং জগতে তাকে বলা হয় বায়ার বা ক্লায়েন্ট আর যিনি কাজ করতে চান তিনি হচ্ছেন ফ্রীল্যান্সার বা কন্ট্রাক্টর। এই বায়ার এবং ফ্রীল্যান্সারদের মাঝে যোগাযোগ এবং সমন্বয় সাধনের জন্য রয়েছে অনেকগুলো ওয়েবসাইট আউটসোর্সিং জগতে যা মার্কেটপ্লেস নামে পরিচিত।

 

মার্কেটপ্লেস এর ভূমিকা:
ফিজিক্যালি মার্কেট বলতে একটি স্থানকে বুঝানো হয় কিন্তু আউটসোর্সিং জগতে মার্কেটপ্লেস একটি স্থানের পাশাপাশি এটি একটি তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। সব ধরণের মার্কেটপ্লেসেই বায়ার এবং ফ্রীল্যান্সার উভয়কেই রেজিস্ট্রেশন করে স্ব স্ব প্রোফাইল জমা দিতে হয়। এই প্রোফাইল দেখেই উভয়পক্ষ একে অপরের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে।

অনলাইন মার্কেটপ্লেস এমন একটা সাইট যেখানে বায়ার বা ক্লায়েন্ট তার কাজ এর বর্ণনা দিয়ে এবং সেই কাজের জন্য তিনি কত ডলার দিবেন তার বর্ণনা দিয়ে কাজ পোস্ট করেন এবং যারা সেই ধরনের কাজ পারেন তাদের আবেদন করতে বলেন। আর ফ্রীল্যান্সার এর কাজ হলো, কাজের বিবরণটি ভালভাবে পড়ে, বুঝে যদি তিনি মনে করেন তিনি কাজটি করে দিতে পারবেন তাহলে কাজটি পাওয়ার জন্য আবেদন দাখিল করা। আউটসোর্সিংর এর ক্ষেত্রে একে বলা হয় বিড করা বা প্রপোজড করা। অনেক আবেদনকারীর মধ্য থেকে বায়ার একজনকে নির্বাচন করে তাকে কাজটি করার অর্ডার দিয়ে থাকেন।

উল্লেখ্য, অনেক মার্কেটপ্লেস আছে যেখানে একজন কন্ট্রাক্টর কি কি কাজ পারেন এবং কত টাকার বিনিময়ে তা করে দিতে ইচ্ছুক সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে পোস্ট করে রাখা হয়। ক্লায়েন্টরা ঐ সকল পোস্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্য থেকে পছন্দ মত একজনকে বেছে নিয়ে কাজ দিয়ে থাকেন।

সারাবিশ্বে বহুসংখ্যক মার্কেটপ্লেস রয়েছে তবে সবগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। যে কয়টি নির্ভরযোগ্য সাইটে কাজ করে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
www.upwork.com
www.fiverr.com
www.freelancer.com
www.guru.com
microworkers.com

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, www.odesk.com ও www.elance.com সাইট দুটি(পূর্বে ছিল) মার্জ হয়ে বর্তমানে আপওয়ার্ক নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। অন্যদিকে www.vworker.com ও www.scriptlance.com সাইট দুটি www.freelancer.com এর সাথে মার্জ হয়ে www.freelancer.com নামে বর্তমান কার্যক্রম চালাচ্ছে।

 

মার্কেটপ্লেসগুলোতে কী ধরণের কাজ পাওয়া যায়?

আগেই বলেছি, কম্পিউটার ব্যবহার করে করা হয় এমন সব ধরণের কাজ আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে করা যায়, চাই কেবল প্রয়োজনীয় দক্ষতা। আপনি কী কাজ করে অনলাইনে অর্থ উপার্জন করবেন তা নির্ভর করবে আপনার যোগ্যতার উপর। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক ধরণের কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে কাজগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয় নিম্নে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হলো।

 

ওয়েব ডিজাইন:

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়েবসাইট বানিয়ে থাকে। কিন্তু এই ওয়েবসাইট বানানোর জন্য তাকে অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে হয়। তাই অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার বা তার প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়েবসাইট বানিয়ে দেয়ার জন্য মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। আর এই ওয়েবসাইট আবার নানা ধরণের হতে পারে। তাই ওয়েব ডিজাইনের কাজ করতে চাইলে অনেক বিষয়ে পারদর্শী হতে হয়।

সকল প্রকার ওয়েবসাইট এর জন্য কমন উপাদান হলো HTML এবং CSS । কাজেই ওয়েব ডিজাইনের কাজ করতে হলে অবশ্যই HTML এবং CSS এ পারদর্শী হতে হবে। ডাইনামিক এবং ই-কমার্স সাইটের জন্য PHP, Java Script, JQuery, Wordpres, Joomla, Drupal, Megento ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা একান্ত জরুরী।

 

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট:

ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট যদিও্ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, প্রকৃতপক্ষে এ’দুটি আসলে হাতের এপিট-ওপিট। ওয়েব ডিজাইনাররা নতুন ওয়েবসাইট তৈরী করেন অন্যদিকে ডেভেলপাররা বানানো সাইট কাস্টমাইজ বা মডিফাই করেন এটাই মূলত তফাত। তবে ডেভেলপার হিসেবে কাজ করতে চাইলে অবশ্যই ওয়েবসাইট তৈরীর বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে ভাল দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কেননা, কোন প্রকার কোডিং সম্পর্কে জ্ঞান না থেকেও একজন ব্যক্তি Wordpres কিংবা Joomla দিয়ে সহজেই একটি ওয়েবসাইট বানিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু HTML, CSS এবং PHP সম্পর্কে ভাল জ্ঞান না থাকলে কোন ভাবেই ওয়ার্ডপ্রেস থিম বা জুমলা টেমপ্লেট কাস্টমাইজ করতে পারবেন না। তাছাড়া ডাইনামিক সাইটে যেসব প্লাগইন ব্যবহার করা হয় প্রোগ্রামিং সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে সেগুলো কাস্টমাইজ করা অসম্ভব।

 

গ্রাফিক্স / লোগো ডিজাইন:

ওয়েবসাইটের জন্য বিভিন্ন ধরণের লোগো, ব্যানার প্রয়োজন হয়। মার্কেটপ্লেসগুলোতে এরকম অনেক লোগো ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ পাওয়া যায়। লোগো ডিজাইনের কাজ করতে হলে ফটোশপ এবং ইলোস্ট্রেটর এ ভাল দক্ষতা থাকা আবশ্যক।

 

ডাটা এন্ট্রি:

অনলাইনে যে সকল কাজ হয় তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো ডাটা এন্ট্রি। তবে কাজ সহজ বলে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিয়োগিতা এখানে বেশী। যদিও ডাটা এন্ট্রির মূল বক্তব্য হলো দেখে দেখে টাইপ করা তবে আউটসোর্সিং জগতে এর পরিধি আরো একটু ব্যাপক। কাজেই ডাটা এন্ট্রির কাজ করতে হলেও ডাটা এন্ট্রির ক্ষেত্রে কী কী ধরণের কাজ করা হয় সে বিষয়ে ভাল ধারণা থাকা আবশ্যক। ডাটা এন্ট্রি কাজের সবচেয়ে সহজ এবং সর্বনিম্ন স্তর হলো ক্যাপচা টাইপ। যেখানে প্রতি ১০০০ ক্যাপচার জন্য বিল পাওয়া যায় ০.৩০ ডলার থেকে ১.৫০ ডলার পর্যন্ত। মানে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম কিন্তু পারিশ্রমিক খুবই নগন্য। তবে ওয়ার্ড, এক্সেল এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিং সম্পর্কে যাদের ভাল দক্ষতা আছে তারা ডাটা এন্ট্রির মাধ্যমে অবশ্যই সম্মানজনক উপার্র্জন করতে পারবেন। মার্কেটপ্লেসে ডাটা এন্ট্রির যেসব কাজ দেয়া থাকে তা হলো-

১. পিডিএফ কিংবা ইমেজফাইল থেকে ওয়ার্ড/এক্সেলে কনভার্ট: কঠিন নয়, পিডিএফ বা ইমেজ ফাইল দেখে দেখে এক্সেল কিংবা ওয়ার্ডে টাইপ করতে হবে।

২. পূর্বে তৈরী কোন এক্সেল ফাইল মডিফাই করতে হবে।

৩. ওয়েব রিসার্চ: ইন্টারনেট থেকে চাহিদামত তথ্য খুঁজে বের করে কোন এক্সেল ফাইলে সংরক্ষণ করতে হবে; ইত্যাদি।

মোটকথা, ওয়ার্ড, এক্সেল এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিং সম্পর্কে ভাল জ্ঞানের পাশাপাশি একটু চৌকষ হতে পারলেই ডাটা এন্ট্রির মাধ্যমে ৩০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত উপার্জন করা খুব একটা কঠিন নয়।

 

এসইও/ ডিজিটাল মার্কেটিং/ এফিলিয়েট মার্কেটিং:

কথা একটাই যে কাজই করুন না কেন দক্ষতার সাথে করতে হবে। মার্কেটপ্লেগুলোতে এসইও/ ডিজিটাল মার্কেটিং/ এফিলিয়েট মার্কেটিং বিষয়ে প্রচুর কাজ পাওয়া যায় এবং কাজের মূল্যমানও অনেক বেশী। তাই যে কেউ চাইলে এসইও/ ডিজিটাল মার্কেটিং/ এফিলিয়েট মার্কেটিং এর মত কোর্স গুলো করে আউটসোর্সিং জগতে ঠাই করে নিতে পারেন।

 

আর্টিকেল লেখা

মার্কটপ্লেসগুলোতে যারা সুন্দর আর্টিকেল লিখতে পারেন তাদের জন্য ঐ লেখনী গুনটাই হতে পারে অনলাইনে উপার্জনের একটি উত্তম হাতিয়ার। মার্কেটপ্লেসগুলোতে ৩০০ থেকে ১০০০ থেকে শব্দের মধ্যে বিষয় ভিত্তিক আর্টিকেল চাওয়া হয়। সৃজনশীল চিন্তন ক্ষমতা এবং ইংরেজীতে পারদর্শী দলে আর্টিকেল লেখার মাধ্যমে উপার্জন করা যায়।

স্ক্রিপট লেখা/ অডিও শুনে লেখা:
কাজটি বেশ সহজ হলে এতে পারিশ্রমিকের পরিমান খুব বেশি নয়। তবে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে এটিও একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। মার্কেটপ্লেগুলোতে এধরণের কাজও পাওয়া যায়।

 

মিনি জব/Micro Works:

খুব ছোট খোট কাজ করেও সহজে অর্থ উপার্জন করা যায় এমন অনেক মার্কেটপ্লেস আছে যেগুলোর মধ্যে microworkers.com অন্যতম সাইট । এসব সাইটে বায়ারেরা বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট কাজ দিয়ে থাকে । সাধারণত Upwork বা Freelance এর মত এসব সাইটে বিড করতে হয় না । এখানে কীভাবে কাজ করতে হয়, প্রত্যেকটি কাজের মূল্য, এক একটি কাজ করতে কতটুকু সময় প্রয়োজন, কতক্ষণ পর পর কাজ পাবেন, কোন কাজের মূল্য কত ও কাজটি করতে কতটুকু সময় প্রয়োজন এসব কিছুর বিবরণ দেয়া থাকে। যেসব কাজ সাধারণত microworkers.com এ থাকে তার কয়েকটি উদাহরন হচ্ছে-

কোন সফটঅয়্যার ডাউনলোড করে ইনষ্টল করা, ফেসবুকে নির্দিষ্ট পেজ লাইক করা, কোথাও ভোট দেয়া, টুইটারে কাউকে ফলো করা থেকে শুরু করে রিভিউ লেখা পর্যন্ত। প্রতিটি কাজের জন্য যে পেমেন্ট দেয় তা সাধারনত ১০ থেকে ৫০ সেন্ট বা ১ ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে। যেকেউই Microworkers.Com বা এরুপ অন্যান্য সাইটে রেজিস্ট্রেশন করে সদস্য হয়ে কোন রকম বিড না করেই ছোট ছোট কাজ করে এসব সাইট থেকে সহজে অর্থ উপার্জন করতে পারেন।

 

সারকথা:

মোটামুটি সব ধরণের মার্কেটপ্লেস এর কার্যক্রম প্রায় একই রকম। প্রত্যেক মার্কেটপ্লেসে কী কী ধরণের কাজ করার সুযোগ আছে তার তালিকা দেয়া থাকে। যোগ্যতা অনুসারে আপনাকে খুঁজে নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মূলত: মার্কেটপ্লেসগুলো বায়ার এবং ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সংযোগস্থাপনকারী তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করে। বায়াররা এসব মার্কেটপ্লেসকে কাজের জন্য নির্ধারিত বিল পেমেন্ট করে থাকে। অত:পর সেই পেমেন্ট কাজ করার পর নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে ফ্রিল্যান্সারদের মার্কেটপ্লেসের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। পরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সেই বিল বা উপার্জিত ডলারগুলো উঠানো যায়। এসব মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সারদের কাজের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া অনেক মার্কেপ্লেসে বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা দিয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়। এগুলো দেখেই বায়াররা তাদের কাজের জন্য যোগ্য ফ্রিল্যান্সার বাছাই করতে পারেন।