প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে বুঝায় একাডেমিক শিক্ষা। একটি শিশু ৪/৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে মোটামুটি ২৩/২৪ বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনুরূপ কোন প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে যে পাঠ গ্রহণ করে সেটাই হচ্ছে মূলতঃ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। কিন্তু কেন এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা? একজন মানুষের জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন এবং কতটা জরুরী? লক্ষ্যহীন কোন কাজই কোন মানুষের জীবনে কখনোই সাফল্য বয়ে আনতে পারেনা। অবশ্য আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লক্ষ্যহীন একথা অনেকেই স্বীকার করতে চাইবেন না। কেননা, বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং অভিভাবকসহ অনেক সহায়ক প্রতিষ্ঠানই আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছেন শিক্ষার্থীকে একটা এ+ সনদ পাইয়ে দেয়ার জন্য। তারমানে একথা বলাই যায় যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্দেশ্যই হলো প্রথমে একটা এ+ তথা ভাল সনদপত্র অর্জন এবং/অতঃপর একটা ভাল চাকুরী। আমার মনে হয় কোন একটি জাতীকে ধ্বংসকরার জন্য এরূপ চিন্তাধারাই যথেষ্ট। আমাদের এই ধরণের চিন্তাধারার কারণেই আমরা এখনো বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর থেকে অন্তত্ঃ ১০০ বছর পিছিয়ে আছি।

যে শিক্ষা শিক্ষার্থীর মাঝে উন্নত চিন্তা এবং উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটায় না, প্রকৃতপক্ষে সেই শিক্ষা অনর্থক। পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায়, “কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগের ফলে যদি বস্তুটির অবস্থানের পরিবর্তন (সরণ) হয়, তাহলে প্রযুক্ত বল এবং বলের দিকে বস্তুর অতিক্রান্ত দূরত্বের গুণফলকে কাজ বলে। ” কাজের সাথে বল, সময় এবং দূরত্বের ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। যদি বল প্রয়োগ করার পর নির্দিষ্ট সময় অন্তে অতিক্রান্ত দূরত্ব শূন্য হয় তাহলে তার কাজের পরিমাণও শূন্য। ঠিক তেমনই ১৭/১৮ বছর ধরে লেখাপড়া (বল প্রয়োগ) করে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তে যদি শিক্ষার্থীর মাঝে উন্নত চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ না ঘটে, তাহলে তার শিক্ষার পরিমাণটাও শূন্য। আর আমাদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবগণ এই অন্তসার শূন্য শিক্ষার পিছনেই ছুটছে প্রতিনিয়ত। সন্তান বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া শিখে একজন ভাল মানুষ হবে, আজকাল এমন ভাবনা ভাবেন এমন অভিভাবক এর সংখ্যা খুবই নগন্য। এখন ভাল মানুষ হওয়ার থেকে ভাল সনদপত্রের গুরুত্ব অনেক বেশী। ফলশ্রুতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, বর্তমানে নাকি সব থেকে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবসা। এখন যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সবথেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী এ+ পায়, সেই প্রতিষ্ঠানকে সবথেকে ভাল প্রতিষ্ঠান বলে মনে করা হয়।

একজন শিক্ষিত মানুষের মাঝে এমন কিছু গুণাবলী থাকা আবশ্যক, যে গুণগুলির মাধ্যমেই জানা যাবে তিনি একজন শিক্ষিত মানুষ। কোন মানুষ শিক্ষিত কি না তা জানার জন্য তার সনদপত্র দেখা আবশ্যক নয়। কেননা, সনদপত্র কোন জ্ঞান নয়; এটা কোন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার স্বীকৃতি মাত্র। প্রত্যেক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেন একজন শিক্ষিত মানুষের মাঝে কমপক্ষে নিচের  বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জিত হয়। শিক্ষিত মানুষের-
১। অবশ্যই সততা, ভদ্রতা ও নম্রতা গুণগুলি থাকা উচিত।
২। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অপরের ক্ষতি সাধন করার প্রবণতা থাকা উচিত নয়।
৩। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনযাপন স্ব-স্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে হওয়া উচিত।
৪। মাতৃভাষাসহ অন্ততঃ দুটি ভাষায় লিখতে, পড়তে এবং কথা বলতে পাড়া উচিত।
৫। দূরদর্শিতা ও উদ্ভাবনী জ্ঞান থাকা উচিত।

আমাদের ডিগ্রীধারীদের মধ্যে শতকরা ঠিক কতজন মানুষের মাঝে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান? সম্ভবত শতকরা ১ ভাগ মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি দূরদর্শিতা ও উদ্ভাবনী জ্ঞানের কথাই ধরা যায়, তাহলে বাস্তবতা হলো এদেশে এমন কোন অশিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কিনা বেকার। হতে পারে তার উপার্জন কম, তবে সে বেকার নয়। প্রকৃতপক্ষে বেকার বলতে এদেশের সনদপত্র ধারী মানুষগুলোকেই নির্দেশ করা হয়ে থাকে।

শিক্ষা যদি তাদের মাঝে দূরদর্শিতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হতো তাহলে কোনভাবেই তাদের বেকার থাকার কথা নয়। যদি একজন কৃষকের সন্তান লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না পায়, তাহলে বেকার না থেকে তার অর্জিত জ্ঞান কৃষিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। যদি কোন ব্যবসায়ীর সন্তান লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না পায়, তাহলে তার অর্জিত জ্ঞান ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। যদি কোন চাকুরীজীবির সন্তান লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না পায়, তাহলে তার উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজে উদ্যোক্তা হয়ে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করার সুযোগ আছে। আর যদি দিনমজুরের সন্তান লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না পায় তাহলে………? প্রকৃতপক্ষে এরাই শিক্ষিত, কারণ কোন দিনমজুরের সন্তান লেখাপড়া শেষ করে চাকুরী না পেলেও বেকার না থেকে প্রয়োজনে দিনমজুরি করে (কিছু ব্যতীক্রম ছাড়া)।

তাহলে সারসংক্ষেপটা কি দাঁড়ালো? অশিক্ষিত মানুষ বেকার নাই; যত বেকার সব শিক্ষিত (সনদপত্র ধারী)। আর শিক্ষা যদি কোন মানুষের মাঝে দূরদর্শীতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে তাহলে একজন শিক্ষিত মানুষ কখনই বেকার থাকতে পারে না। আর এমনটি হলে নিশ্চিত সে দেশ ও জাতি হবে উন্নত এবং বিশ্বের দরবারে অন্যান্য উন্নত দেশের মতই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

মোঃ আব্দুল হাই খান
পরিচালক
গাইবান্ধা কম্পিউটার এন্ড আইটি এডুকেশন।
E-mail: haikhan2002@gmail.com

No Comments

    Leave a reply