অ্যাপ বানিয়ে আইমানের চমক

কম্পিউটার টেবিলটা তেমন আটপৌরে নয়। আছে কেবল একটি মনিটর, সঙ্গে একটি পিসি। এই টেবিলে বসেই মাউস, কী বোর্ড দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের একটি অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ)। তাও কোনো প্রকৌশলী, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নয়, মাত্র ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী। তাক লাগানো উদ্ভাবন। পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে। চমক লাগানো এ শিক্ষার্থীর নাম আইমান আল আনাম। উদ্ভাবিত অ্যাপের নাম দেওয়া হয়েছে মা ‘লিটা আকতার’র নামের প্রথম অংশ দিয়ে ‘লিটা ফ্রি ভিডিও ভয়েস কল ও চ্যাট’। প্রবল আগ্রহ, কম্পিউটারপ্রীতি, ইন্টারনেটের জ্ঞানভান্ডার এবং ইউটিউবকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করে ফেলেছে চমৎকার একটি অ্যাপ। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে ব্যবহার। প্রতিদিনই বাড়ছে ব্যবহারকারীর সংখ্যা।
আইমান চট্টগ্রাম নগরের সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এক ভাই এক বোনের মধ্যে সে বড়। মা লিটা আক্তার গৃহিণী।

বদলে দেওয়া চিঠি
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। আইমানের জন্য দিনটি আর ১০টি দিনের মতো ছিল না। জীবনের বাঁক বদলে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা ঘটেছিল ওইদিন। সেদিন গুগল কর্তৃপক্ষ থেকে আইমানের কাছে আসে একটি মেইল। ওই মেইলে লেখা ছিল- ‘ওয়েলকাম টু গুগল প্লে স্টোর, থ্যাংকস ফর জয়েনিং আস ইউ হ্যাভ জাস্ট বিকাম পার্ট অব এ ওয়ার্ল্ডওয়াইড কমিউনিটি অব ডেভলপারস দ্যাটস অ্যানগেজ অ্যান্ড ডিলাইটস’। অ্যাপস তৈরির গল্পের সফলতার শুরু এখানেই। এরপর থেকেই শুরু হয় ডাউনলোড করা, আগ্রহ তৈরি হয় দেশ-বিদেশের ব্যবহারকারীদের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, কাতার, আরব আমিরাত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি ব্যবহার করছে বলে তার পরিবার জানায়। গত ২০ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ব্যবহারকারী অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন বলে তথ্য এসেছে এটির এডমিনের কাছে।

 

গল্পের শুরুর কথা
২০১৮ সালের নভেম্বর মাস। আইমান পড়ছে মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে। তখনই তার চিন্তায় ভর করে, দেশে বর্তমানে ইন্টারনেটভিত্তিক কল, ভিডিও ও চ্যাটের জন্য ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা ভাইবার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সবগুলোর উদ্ভাবক বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিবিদ। বাংলাদেশের তৈরি এ জাতীয় কোনো অ্যাপ নেই। ২০১৯ সালের মার্চে এলোমেলো ভাবনাগুলো নিয়ে কাজ শুরু করে আইমান। নিয়মিত লেখাপড়া, ক্লাস এবং পরীক্ষার ফাঁকে চলছে অ্যাপ তৈরির কাজ। ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর চূড়ান্তভাবে তৈরির পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় গুগল কর্তৃপক্ষের কাছে। গুগলের নিজস্ব যাচাই-বাছাই শেষে ৩১ ডিসেম্বর আসে ফাইনাল চিঠি। ওই দিন সাড়ে ৮টায় গুগল প্লে স্টোরে সেটি আপলোড করা হয়। অ্যাপের বর্ণনার নিচে লেখা আছে, ‘অ্যাপ ক্রিয়েটেড বাই আইমান আল আনাম।’ এর মধ্য দিয়েই স্বীকৃতি মিলল ছোট্ট এই প্রযুক্তিবিদের। আইমান আল আনামের ভাষায়, “অন্য দেশের তৈরিকৃত অ্যাপ ব্যবহারের বিষয়টি আমাকে খুব ভাবায়। ভাবনা থেকে নিজেই একটি অ্যাপ তৈরির চিন্তা করি। বিদেশিরা পারলে আমরা কেন পারব না মূলত এমন মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করি। নিজের মনোবল দিয়ে অবশেষে অ্যাপ তৈরি করি। নাম রাখি মায়ের নামেই- ‘লিটা ফ্রি ভিডিও ভয়েস কল ও চ্যাট’।” আইমান বলল, আমার স্বপ্ন, বিদেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে দেশে এসেই প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে চাই। আমি একজন প্রযুক্তি প্রকৌশলী হতে চাই। দেশের জন্য নতুন নতুন অ্যাপস তৈরি করাই আমার স্বপ্ন।’

অ্যাপের বৈশিষ্ট্য
বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েই তৈরি করা হয়েছে অ্যাপটি। এটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে পরিষ্কার এবং স্পষ্ট ভিডিওর মাধ্যমে কথা বলা যাবে। তাছাড়া, বর্তমানে ব্যবহৃত যোগাযোগের অ্যাপসগুলোর চেয়ে এটির ভিডিওর মান অনেক উন্নত। অন্যগুলোতে চ্যাট করার সময় ছবি ফেটে বা ঝাপসা দেখা গেলেও এটিতে এমনটি হবে না। কারণ, এটির মান হাইডেফিনেশনের (এইচডি)। একই সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যেই বড় ফাইল আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে। আছে সাদাকালো এবং রঙিন ছবি ব্যবহারের সুযোগ। আর ভিডিও চ্যাটকারীরা ইচ্ছা করলে নিজের ছবিকে ছোট-বড় করে কথা বলার সুযোগও আছে।

বাবার স্বপ্ন আলোকিত মানুষ, বড় মানুষ নয়
আইমানের বাবা তৌহিদুস সামাদা নিষাধ, একজন ব্যবসায়ী। ছেলেকে নিয়ে উচ্ছ্বাস আর আবেগ আছে, কিন্তু উচ্চাকাক্সক্ষা কিংবা অভিলাষ নেই। তিনি বললেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই তার আগ্রহ ছিল কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকার। সব সময় লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে খেলাধুলা, আড্ডা কিংবা অলসভাবে সময় পার না করে সে প্রতিনিয়তই কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকত। প্রতিদিনের অধ্যবসায়টা তাকে আজকের সাফল্য এনে দিয়েছে। তাই ছেলেকে নিয়ে আমার উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। আমি চাই, সে আলোকিত এবং ভালো মানুষ হবে, বড় মানুষ নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকের ধারণা, সন্তান অতিমাত্রায় প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু আমি মনে করি, এখানে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির। প্রশ্নটা হলো আমি প্রযুক্তি নিয়ে কী করছি সেটা। প্রযুক্তির যথাযথ সদ্ব্যবহার করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রয়োজন অভিভাবকদের যথাযথ তদারকি এবং সচেতনতা।’

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রকাশঃ ২৫ জানুয়ারী ২০২০

No Comments

    Leave a reply